সিলেটের ইফতারি প্রথা সামাজিক মর্যাদা প্রমাণের কুসংস্কার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছবি: দৈনিক উত্তরপূর্ব

আগেকার দিনে মেয়ের বাড়িতে ইফতার পাঠানো হতো, আম-কাঠাল পাঠানো হতো। তার পিছনে যুক্তি ছিলো, আছে। তখন যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত ছিলোনা। কথায় কথায় বাপের বাড়ি আসা যেতো না। শুধু মেয়ে-জামাইকে দাওয়াত দেয়াটাও তখনকার দিনে অসভ্যতা ছিলো, তাই হয়তো আয়োজন করে ইফতার পাঠানো হতো। আজ সেই যুগ নেই। সায়েস্তা খার আমলের হিসেব করে কি এখন চলা যাবে?

মানুষের সাধ আর সাধ্য এদুটোর সমন্ময় করা আজকাল খুব কষ্টকর। তাই এসব প্রথাকে বিদায় দেয়া উচিত। কিন্তু বিদায় কি দিয়েছি? বরং সে প্রথার গায়ে আরো রঙ্গিন ঝালর, জরি, চুমকি লাগিয়ে ঝলমলে করে এটাকে অবশ্য অবশ্য কর্তব্য বানানো হয়েছে। কতো অসহায় বাপ-ভাই ধার-কর্জ করে মেয়ে-বোনের বাড়ি ইফতার নিয়ে যাচ্ছে, আমরা কি তা দেখি? ইফতারি না আসায় কত মেয়েকে কত ভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে সে চাপা কান্না কি আমাদের কানে আসে?

অনেকেই মনে করেন, আপনজনকে নিয়ে ইফতার করা আর বাধ্যতামূলক ইফতারি প্রথা এক নয়। মেয়ের বাবা নিজ উদ্যোগে যদি হালকা ইফতারি নিয়ে মেয়ের বাড়িতে জামাই, বিয়াই-বিয়াইনদের সাথে ইফতার করেন সেটা সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু বাধ্যতামূলকভাবে যদি ইফতার পাঠাতে হয় তাহলে তা কুসংস্কার এবং এক ধরনের যৌতুক।

দৈনিক নয়া দিগতন্তের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছয়ফুল ইসলাম (ছন্দনাম) (৪৫)। পেশায় একজন কৃষক। অভাব অনটনের সংসার। রমজানের মাস খানেক আগে প্রথম মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। এরই মধ্যে দেখতে দেখতে চলে আসছে পবিত্র রমজান মাস। ছয়ফুল ইসলামের স্ত্রীর আবদার মেয়ের বাড়িতে ‘পয়লা ইফতারি’ ঘটা করে পাঠাতে হবে, তা না হলে মেয়ের মুখ উজ্জ্বল হবে না শ্বশুরবাড়িতে। এমনিতেই মেয়ে বিয়ে দিয়ে ছয়ফুল ইসলামের হাতে নেই কোনো টাকা-পয়সা। তার ওপর মেয়ের বাড়িতে পাঠাতে হবে ইফতারি এ যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। কি আর করবেন অনেক কষ্ট করে আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা ঋণ করে মেয়ের বাড়িতে ইফতারি দেয়ার প্রথা রক্ষা করেন।

ছয়ফুল ইসলামের মতো ইফতারি প্রথা রা করতে গিয়ে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে নানাভাবে হিমশিম খেতে হয়। তার মতে অনেক পরিবারের কাছে ইফতারি ঐতিহ্য মনে হলেও আমাদের কাছে যেন আতঙ্কের নাম। বড় লোকদের কাছে মেয়ের বাড়িতে ইফতারি পাঠানো অনেকটা আনন্দের মনে হলেও চরম বিপাকে পড়তে হয় গরিব পরিবারগুলোকে।

রাহিমা বেগম নামের এক ব্লগার উইমেনস ওয়ার্ডস নামক ব্লগে লিখেছেন, ‘…আমাদের সিলেটের ধনি পরিবারগুলো মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে সামান্য লোক দেখানো স্টেটাস বাড়াতে গিয়ে সিলেটে ইফতার আর আম কাঁঠলি নামক যে যৌতুক প্রথা চালু রেখেছেন, তা দরিদ্র, নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত পরিবার গুলোর কতটা কান্নার কারণ।’

গত কিছুদিন ধরেই ফেসবুকে অনেকের ওয়ালে ইফতার প্রথাবিরোধী একটি লেখা ঘুরছে। ঠিক কে এই স্ট্যাটাসটি লিখেছেন তা জানা যায়নি। তবে এতে দাবি করা হয়েছে, সিলেটের এই ইফতার প্রথার সঙ্গে ধর্মের কোনও যোগসূত্র নেই।  এতে লেখা হয়েছে, মেয়ে বাড়ি থেকে ইফতারি ও আম কাঁঠালি পাঠানোর মতো জুলুম বন্ধ হোক। দীর্ঘ দিন ধরে সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই কু-প্রথা বা রসুম চালু রয়েছে। কুরআন-হাদিস খুললে এর কোনও সত্যতা পাওয়া যায় না। অনেকেই এই প্রথাকে সামাজিক প্রথা হিসেবে মেনে চলছেন।

হ্যাঁ, রমজানে কাউকে ইফতার করানো সুন্নাত। এটা অনেক পূন্যের কাজ। এ ব্যাপারে নবী করিম (সঃ) বলেছেন, ‘কোন রোজাদারকে ইফতার করালে সে ও সমপরিমাণ সওয়াব পাবে, তবে রোজাদারের কোনও সওয়াব কমবে না।’
কিন্ত দেখা গেছে, মেয়েবাড়ি থেকে ইফতারি ও আম-কাঁঠালি জোরপূর্বক আদায় করা হচ্ছে। মেয়েকে শ্বশুড় বাড়ির লোক গালমন্দ করছেন অহরহ। যার ফলে নিরীহ ওই গৃহবধূকে নীরবে চোখের জল ফেলতে হচ্ছে। এছাড়া কি- ই বা করার আছে তার। এই সকল কু-প্রথার কারণে অনেক মেয়েরর বিবাহ বিচ্ছেদ এমনকি আত্মহত্যার ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে।’

মন্তব্য

টি মন্তব্য করা হয়েছে