অমাবস্যার ঘোর অন্ধকার রাত। আকাশটা যেন কেউ কালির দোয়াত উপুড় করে লেপে দিয়েছে। জানালার ধারে বসে যখন লেখার ভাবনায় মগ্ন, ঠিক তখনই হুতুম প্যাঁচার ডাক ছাপিয়ে কানে এল এক অদ্ভুত ফিসফিসানি। প্রথমে মনে হলো মনের ভুল, কিন্তু জানালার ওপাশ থেকে ভেসে আসা হিসহিস শব্দ আর কর্কশ কণ্ঠস্বর বুঝিয়ে দিল, আমি একা নই। কেউ একজন আমাকে সাবধান করছে। সেই অলৌকিক কথোপকথন আর তার পরবর্তী ভয়াবহ পরিণতির কথা ভাবলে এখনো গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়।
অমাবস্যার রাতে অশরীরীর সঙ্গে কথোপকথন
সে রাতে অদৃশ্য এক সত্তার সঙ্গে আমার যে বাক্যবিনিময় হলো, তা ছিল রীতিমতো পিলে চমকানো। আমার শরীর তখন ভয়ে অবশ, কান দিয়ে যেন গরম বাতাস বের হচ্ছে, আর বুকটা ধড়ফড় করছে কামারশালার হাঁপানির মতো। সেই অদৃশ্য আগন্তুক জানতে চাইল আমি কী লিখছি। যখন বললাম ভূতের গল্প লিখছি, সে ব্যঙ্গ করে উঠল। ভূত না দেখেই ভূতের গল্প? আমার সোজা সাপটা উত্তর ছিল, না দেখে কল্পনায় বানিয়ে লেখার মজাই আলাদা। কিন্তু এই উত্তরটাই কাল হলো।
আগন্তুক নিজের পরিচয় দিল ভূত হিসেবে। আমার অনুনয় সত্ত্বেও সে যাওয়ার পাত্র নয়। উল্টো আমাদের মতো লেখকদের ওপর তার তীব্র ক্ষোভ ঝাড়ল। তার অভিযোগ, আমরা লেখকরাই নাকি ভূত সমাজকে মানুষের কাছে হিংস্র আর ভয়ংকর হিসেবে তুলে ধরেছি। অথচ তাদের মধ্যেও নাকি ভালো-মন্দ আছে, তারা মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চায়। কিন্তু আমাদের কলমের খোঁচায় তারা আজ শুধুই আতঙ্কের নাম। আমার ঔদ্ধত্যের জবাব দিতে সে এক অদ্ভুত শাস্তির বিধান দিল। আমার মুখে গরম ফু দিয়ে বলল, “তোর পেছনে একটা লেজ গজাবে। তখন দুষ্টু শিশুরা তোকে দেখে ভাববে তুই গরু, গাধা নাকি বান্দর।” সেই অভিশাপ দিয়ে লাটিমের মতো ঘুরতে ঘুরতে সে উধাও হয়ে গেল।
কল্পনার জগত থেকে রূঢ় বাস্তবে ফেরা
সেদিনের পর থেকে আমার শারীরিক অবস্থা শোচনীয়। শরীরের পেছনের দিকটায় টনটন ব্যথা, হাত দিয়ে অনুভব করছি গোল আলুর মতো কিছু একটা ঠেলে বের হচ্ছে। জ্বরের ঘোরে এখন ১০৩ ডিগ্রিতে পুড়ছি। এটি কি হ্যালুসিনেশন নাকি সত্যি সেই ভূতের অভিশাপ, তা বোঝার ক্ষমতা আমার লোপ পেয়েছে। বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে মনে হলো, কল্পনার ভূতের গল্প লিখতে গিয়ে যদি এই দশা হয়, তবে বরং বাস্তবের মাটিতে পা রাখা যাক। মনকে অন্যদিকে ঘোরাতে এবং নতুন কিছু জানার আগ্রহে আমি ২০২৬ সালের জন্য প্রস্তাবিত কিছু ‘নন-ফিকশন’ বা প্রবন্ধধর্মী বইয়ের তালিকায় চোখ বোলালাম। কল্পনার ভূত যখন লেজ গজাচ্ছে, তখন দেখা যাক বাস্তবের বইগুলো মস্তিষ্কে কী পরিবর্তন আনে।
২০২৬ সালের কিছু অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ বইয়ের তালিকা
নতুন বছরে যারা নতুন কিছু শিখতে চান, তাদের জন্য এই বইগুলো হতে পারে চোখের ঠুলি খুলে দেওয়ার মতো। প্রযুক্তি থেকে শুরু করে অপরাধ জগত, এমনকি পায়ের তলার মাটি—সব বিষয় নিয়েই রয়েছে গভীর গবেষণা।
আ ফ্লাওয়ার ট্রাভেলড ইন মাই ব্লাড (হেলি কোহেন গিলিল্যান্ড) সাংবাদিক হেলি কোহেন গিলিল্যান্ডের এই বইটি আর্জেন্টিনার সেই দাদিদের অবিশ্বাস্য সংগ্রামের কাহিনী তুলে ধরেছে, যারা তাদের হারিয়ে যাওয়া সন্তান ও নাতি-নাতনিদের খুঁজে পেতে একজোট হয়েছিলেন। আর্জেন্টিনার স্বৈরশাসনামলে ‘ডার্টি ওয়ার’-এর সময় প্রায় ৩০,০০০ মানুষকে গুম করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৩০০-এর বেশি গর্ভবতী নারী ছিলেন, যাদের নবজাতকদের জোরপূর্বক দত্তক দেওয়া হয়েছিল। ‘আবুয়েলাস দে প্লাজা দে মেয়ো’ আন্দোলনের এক নারীর কয়েক দশকের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে লেখিকা পারিবারিক বন্ধন ও পরিচয় সংকটের গভীর আখ্যান রচনা করেছেন।
ব্ল্যাক ইন ব্লুজ (ইমানি পেরি) আমরা প্রায়ই উদাসীনভাবে ছবি দেখি, কিন্তু রঙের ভেতরেও যে গভীর ইতিহাস লুকিয়ে থাকতে পারে, তা দেখিয়েছেন ইমানি পেরি। তিনি নীল রঙের মাধ্যমে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের প্রজন্মের পর প্রজন্মের ইতিহাস অন্বেষণ করেছেন। নীল এখানে শুধু রং নয়—এটি আশা, এটি শব্দ, আবার এটিই সেই নীল বা ইন্ডিগো, যা দাস প্রথার সময় বিনিময়ের মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
কেয়ারলেস পিপল (সারাহ উইন-উইলিয়ামস) ফেসবুকের ভেতরের অন্দরমহল নিয়ে লেখা এই বইটি এক সতর্কবার্তা। সারাহ ছিলেন একজন আদর্শবাদী কূটনীতিক, যিনি বিশ্বাস করতেন ফেসবুক ভূ-রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু তার সেই স্বপ্নভঙ্গ হয় যখন তিনি দেখেন, কোম্পানির কর্তাব্যক্তিরা তাদের হাতে থাকা অসীম ক্ষমতার গুরুত্ব বুঝতে ব্যর্থ। যদিও মেটা এই বইয়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবুও এটি কর্পোরেট লোভ ও হারানো আদর্শের এক দালিলিক প্রমাণ।
গার্ল অন গার্ল (সোফি গিলবার্ট) ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে পপ সংস্কৃতি কীভাবে তরুণীদের নিজেদের বিরুদ্ধেই দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল, তা নিয়ে সোফি গিলবার্টের এই বিশ্লেষণ। সেই সময়ের মিডিয়া নারীদের বিভ্রান্তিকর বার্তা দিত—একদিকে সতীত্বের বুলি, অন্যদিকে ‘গার্লস গন ওয়াইল্ড’-এর মতো উশৃঙ্খলতা। ক্ষমতায়নের মোড়কে কীভাবে পণ্যিকরণ বিক্রি হতো, তা এই বইয়ে উঠে এসেছে।
ইজ আ রিভার অ্যালাইভ? (রবার্ট ম্যাকফারলেন) প্রকৃতি বিষয়ক লেখক রবার্ট ম্যাকফারলেন নদীকে দিয়েছেন মানুষের মতো কণ্ঠস্বর। তিনটি ভিন্ন নদীর জীবনচক্র, তাদের বিপদ এবং টিকে থাকার লড়াই নিয়ে লেখা এই বইটিতে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—নদী কি জীবন্ত? তার ভাষা ও বর্ণনার জাদুতে বইটিকে মহাকাব্যিক মনে হয়।
মুড মেশিন (লিজ পেলি) স্পটিফাই কীভাবে আমাদের গান শোনার অভ্যাস বদলে দিয়েছে, তা নিয়ে লিজ পেলির এই বই। স্ট্রিমিং সার্ভিসগুলো আমাদের শোনার অভিজ্ঞতাকে নিষ্ক্রিয় করে দিচ্ছে এবং সৃজনশীলতার পথকে সংকুচিত করছে। আধুনিক মিউজিক ল্যান্ডস্কেপে আমরা যে এক ধরনের শোষণমূলক সম্পর্কের মধ্যে আটকা পড়েছি, তা এই বইয়ে নিপুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
জ্বরে তপ্ত শরীরে এই বইগুলোর সারসংক্ষেপ পড়তে পড়তে ভাবছি, ভূতের দেওয়া লেজ গজানোর অভিশাপের চেয়ে মানুষের তৈরি এই বাস্তব জগতটা কম রোমাঞ্চকর বা কম ভয়াবহ নয়। হয়তো এই বইগুলোই আমার এখনকার একমাত্র নিরাময়।